অ্যান্টার্কটিক বরফ এক চলমান নক্ষত্র-মলিনতার বৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে

পৃথিবী যেন প্রাচীন এক নক্ষত্র বিস্ফোরণ থেকে আসা নক্ষত্রধূলির চিহ্ন সংগ্রহ করছে, সেটিও কোনো নাটকীয় বিস্ফোরণের আকারে নয়, বরং অ্যান্টার্কটিক বরফে নথিভুক্ত এক পাতলা, অবিরাম ধুলোঝরার মতো। মূল চিহ্নটি হলো আয়রন-৬০, একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ যা পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয় না এবং বৃহৎ নক্ষত্রে উৎপন্ন হয়ে সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রদত্ত উৎস পাঠ অনুযায়ী, আয়রন-৬০-এর অর্ধায়ু ২.৬ মিলিয়ন বছর। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সৌরজগৎ ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে গঠিত হওয়ার সময় বিদ্যমান কোনো আয়রন-৬০ এতদিনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। আজ যদি বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে আয়রন-৬০ খুঁজে পান, তবে তা আমাদের গ্রহের বাইরে থেকে পরে এসে থাকতে হবে।

বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই জানতেন যে কাছাকাছি সুপারনোভা থেকে সৌরজগৎ অন্তত দু’বার আয়রন-৬০-এর আঘাত পেয়েছিল, যার প্রমাণ গভীর সমুদ্রের তলানিতে ও চন্দ্রশিলায় সংরক্ষিত আছে। নতুন ধাঁধাটি এসেছে আরও সাম্প্রতিক এক সংকেত থেকে: ২০ বছরেরও কম বয়সী অ্যান্টার্কটিক পৃষ্ঠ-বরফে আয়রন-৬০ শনাক্ত হয়েছে। এত সাম্প্রতিক উপাদানের ব্যাখ্যা দিতে কাছাকাছি কোনো সুপারনোভা ছিল না।

লোকাল ইন্টারস্টেলার ক্লাউড একটি উত্তর দিতে পারে

উৎস পাঠ বলছে, বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন লোকাল ইন্টারস্টেলার ক্লাউড হয়তো এই ধাঁধার সমাধান দিতে পারে। গ্যাস ও ধুলোতে ভরা এই বিশাল অঞ্চল আমাদের মিল্কি ওয়ের এই অংশকে ঘিরে আছে, আর সৌরজগৎ এখন এর মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। যদি সেই ক্লাউডে কোনো প্রাচীন সুপারনোভার আয়রন-৬০ থেকে থাকে, তবে তা এক ধরনের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করতে পারে, এবং পৃথিবী ওই ধুলোময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় খুব অল্প পরিমাণে সেই উপাদান ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে পারে।

ড্রেসডেনের HZDR-এ ড. ডোমিনিক কোল ও অধ্যাপক অ্যান্টন ওয়ালনারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক দল EPICA ড্রিলিং প্রকল্পের অ্যান্টার্কটিক বরফ-কোর বিশ্লেষণ করেছে। ওই নমুনাগুলো প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৮০,০০০ বছর আগে জমা হওয়া বরফকে কভার করেছিল, যা উৎস পাঠে সেই সময়ের সমতুল্য বলে বর্ণিত হয়েছে যখন সৌরজগৎ প্রথম ক্লাউডে প্রবেশ করেছিল।

ফলাফল ছিল শুধু আয়রন-৬০ শনাক্ত করা নয়, বরং একটি পরিবর্তনশীল ধরণ। উৎস পাঠ বলছে ৪০,০০০ থেকে ৮০,০০০ বছর আগে পৃথিবীতে কম আয়রন-৬০ পৌঁছেছিল, যা সাম্প্রতিক নমুনার তুলনায় কম। এর মানে সৌরজগৎ সম্ভবত আগে ক্লাউডের তুলনামূলক কম ঘন অঞ্চল দিয়ে যাচ্ছিল, পরে আরও ঘন অঞ্চলে ঢুকেছে।

এই তারতম্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সম্ভবত সেই তারতম্যই। যদি আজ পৃথিবীতে পৌঁছানো আয়রন-৬০ কেবল বহু পুরোনো সুপারনোভা ঘটনার অবশিষ্টাংশ হতো, তাহলে বিজ্ঞানীরা এত দ্রুত ও সুস্পষ্ট পরিবর্তন আশা করতেন না। উৎস পাঠ বলছে, সেই বিকল্প ব্যাখ্যার জন্য সংকেতটি খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। অন্য কথায়, ক্লাউডটি কেবল পটভূমি নয়। সম্ভবত এটাই এখন পৃথিবীতে পৌঁছানো উপাদানের তাত্ক্ষণিক উৎস।

এতে গবেষণাটি বিরল পরমাণুর চমৎকার শনাক্তকরণের চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ওঠে। এটি সৌরজগতের বর্তমান গ্যালাকটিক পরিবেশকে এমন এক সক্রিয় উপাদানে পরিণত করে, যা আমাদের গ্রহে কী পৌঁছায় তা প্রভাবিত করে। পৃথিবী কেবল প্রাচীন নক্ষত্র বিস্ফোরণের স্থির নথি বহন করছে না। সেই বিস্ফোরণের রেখে যাওয়া ধ্বংসাবশেষের সঙ্গেই এখনও তা পারস্পরিক ক্রিয়ায় যুক্ত।

এটি ব্যাখ্যায় একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। আয়রন-৬০-কে শুধু দূর অতীতের ঘটনার ভূতাত্ত্বিক আর্কাইভ হিসেবে দেখার বদলে, গবেষকেরা এখন এটি ব্যবহার করে সৌরজগৎ কীভাবে আন্তঃনাক্ষত্রিক কাঠামোর মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয় তা বুঝতে পারেন।

প্রায় কিছুই না খোঁজার মতো

উৎস পাঠে বর্ণিত কাজটি তার ব্যাপ্তি ও কঠিনতার জন্য উল্লেখযোগ্য। দলটি নাকি প্রায় ৩০০ কেজি অ্যান্টার্কটিক বরফ ব্রেমারহাফেন থেকে ড্রেসডেনে নিয়ে আসে, রাসায়নিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে, এবং তা কয়েকশো মিলিগ্রাম ধূলিতে নামিয়ে আনে। সেই অবশিষ্টাংশ থেকে আয়রন-৬০ পরমাণু আলাদা করতে হয়।

উৎস পাঠ এই অনুসন্ধানকে ৫০,০০০টি ফুটবল স্টেডিয়াম, প্রতিটি খড়ে ভরা, সেখানে একটি সুচ খোঁজার সঙ্গে তুলনা করেছে। এটি বিশ্লেষণাত্মক চ্যালেঞ্জের একটি তীব্র বর্ণনা, তবে এমন ফলাফল কেন গুরুত্বপূর্ণ সেটাও বোঝায়। পৃথিবীর বরফে অতি ক্ষুদ্র বহিঃস্থ সংকেত শনাক্ত করতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে কড়া নজর, নির্ভুল পৃথকীকরণ পদ্ধতি, এবং এমন সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি দরকার যা একটি আইসোটোপকে বিশাল পটভূমি পদার্থ থেকে আলাদা করতে পারে।

এই ধরনের গবেষণা প্রায়শই বিজ্ঞানী-সমাজের ধারণা বদলে দেয় কারণ তারা চমকপ্রদ ছবি তৈরি করে না, বরং প্রায় অদৃশ্য একটি সংকেতকে পরিষ্কারভাবে পুনরুদ্ধার করে। এই ক্ষেত্রে, সেই সংকেত গবেষকদের আমাদের সৌরজগৎ এখন যে অঞ্চলে আছে, সে সম্পর্কে কিছু বলছে।

আমাদের সৌরজগত সম্পর্কে এর মানে কী

এই ফলাফলটি এই ধারণাকে শক্তিশালী করে যে সৌরজগৎ শূন্য মহাকাশের মধ্যে দিয়ে চলেনি। এটি নিজস্ব ইতিহাস, ঘনত্বের পরিবর্তন, এবং প্রাচীন জ্যোতির্পদার্থগত ঘটনার সংরক্ষিত ধ্বংসাবশেষ-সহ একটি গঠিত স্থানীয় পরিবেশের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তাই লোকাল ইন্টারস্টেলার ক্লাউড কেবল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য মানচিত্রের লেবেল নয়। এটি কাছাকাছি নক্ষত্র ইতিহাসের এক সক্রিয় আর্কাইভ হতে পারে, যা পৃথিবীতে পরিমাপযোগ্য ছাপ রেখে যায়।

এর মানে এই নয় যে ধুলোটি বিপজ্জনক বা নাটকীয়। উৎস পাঠে বর্ণিত সংকেত অত্যন্ত ক্ষীণ। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এটি শক্তিশালী, কারণ এটি গ্রহবিজ্ঞান, মেরু বরফের রেকর্ড, জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা এবং সৌরজগতের গ্যালাকটিক গতিকে একক কাহিনিতে যুক্ত করে।

এটি ভবিষ্যৎ গবেষণার পথও খুলে দেয়। যদি পৃথিবী ক্লাউডের বিভিন্ন অংশ অতিক্রম করার সময় আয়রন-৬০-এর মাত্রা বদলায়, তবে দীর্ঘতর রেকর্ড ও বেশি নমুনা স্থানীয় আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিবেশের গঠন আরও নির্ভুলভাবে পুনর্গঠনে সাহায্য করতে পারে। বিজ্ঞানীরা শেষ পর্যন্ত বরফ, সমুদ্রতল এবং চন্দ্র-রেকর্ডের তুলনা করে, বিভিন্ন যুগে আন্তঃনাক্ষত্রিক পদার্থ কীভাবে পৃথিবীতে এসেছে তার আরও স্পষ্ট সময়রেখা তৈরি করতে পারেন।

নাক্ষত্রধূলি প্রাচীন স্মৃতি নয়, চলমান এক প্রক্রিয়া

এই আবিষ্কারের বিস্তৃত আকর্ষণ প্রযুক্তিগত যতটা, ততটাই ধারণাগতও। “আমরা নক্ষত্রধূলি দিয়ে তৈরি” একটি পরিচিত বাক্য, কিন্তু এই গবেষণা তাকে বর্তমান কালের মাত্রা যোগ করে। উৎস পাঠের ইঙ্গিত হলো, পৃথিবী কেবল দূর অতীতে প্রাচীন নক্ষত্রপদার্থ দিয়ে তৈরি হয়নি। আমাদের সৌরজগৎ এখন যে ক্লাউডের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে সঞ্চিত বিস্ফোরিত নক্ষত্রের অবশিষ্টাংশ দিয়ে আজও, যদিও খুব হালকাভাবে, পৃথিবী ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে।

এতে মহাবিশ্ব কম দূরের মনে হয়। যে সুপারনোভা এই আয়রন-৬০ তৈরি করেছিল, সেটি বহু আগেই নেই, কিন্তু তার উৎপাদিত বস্তু এখনও মহাকাশে ঘুরছে, এখনও অ্যান্টার্কটিক বরফে নমুনা করা হচ্ছে, আর এখনও বিজ্ঞানীদের মিল্কি ওয়ের মধ্যে আমাদের সৌরজগতের সাম্প্রতিক পথ পড়তে সাহায্য করছে। সেই অর্থে, এই গবেষণা কেবল বহু পুরোনো কোনো নক্ষত্রের সঙ্গে কী ঘটেছিল তা নিয়ে নয়। এটি আমরা এখন কোথায় আছি, তা নিয়েও।

এই নিবন্ধটি Universe Today-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। মূল নিবন্ধটি পড়ুন.

Originally published on universetoday.com