রক্তের স্টেম কোষ রক্ত ও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার ভিত্তি। প্রধানত অস্থিমজ্জায় পাওয়া এই কোষগুলো সারা জীবন একজন মানুষের প্রয়োজনীয় রক্ত ও রোগপ্রতিরোধী কোষ তৈরি করে চলে। নিজেদের পুনর্নবীকরণ করার ক্ষমতার কারণে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন এবং রক্তের রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য তৈরি জিন থেরাপিতেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
তবে চিকিৎসার জন্য এই কোষগুলো প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া তাদের দুর্বল করে দিতে পারে। জিন থেরাপির আগে রক্তের স্টেম কোষকে পরীক্ষাগারে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়। এই ধাপ তাদের পুনরুৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং চিকিৎসা প্রত্যাশামতো কাজ করার সম্ভাবনা হ্রাস করতে পারে। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের Institute for Regenerative Medicine-এর গবেষকেরা এখন এমন একটি সিগন্যালিং পদ্ধতি শনাক্ত করেছেন, যা ওই প্রক্রিয়ার সময় কোষগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে।
EMBO Molecular Medicine-এ প্রকাশিত গবেষণায় দলটি পরীক্ষা করেছে, সক্রিয় প্রোটিন C বা aPC কীভাবে মানব রক্তের স্টেম কোষকে প্রভাবিত করে। তারা দেখেছে, অল্প সময় aPC-এর সংস্পর্শে রাখলে কোষগুলোকে নিষ্ক্রিয় ও সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা যায় এবং প্রাণী মডেলে তাদের প্রতিস্থাপন-ক্ষমতাও বাড়ে।
একটি রিসেপ্টর, সম্পূর্ণ ভিন্ন ফল
গবেষকেরা aPC-এর সঙ্গে থ্রম্বিনের তুলনা করেছেন, যা রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি প্রোটিন। দুই প্রোটিনই একই কোষীয় রিসেপ্টর, protease-activated receptor 1 বা PAR1-এর মাধ্যমে কাজ করে। তবু দুই প্রোটিন দিয়ে ওই রিসেপ্টর সক্রিয় করলে একই জৈবিক ফল পাওয়া যায়নি।
জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, aPC রক্তের স্টেম কোষকে কুইসেন্ট অবস্থায় থাকতে সাহায্য করেছে—এটি এমন এক বিশ্রাম-অবস্থা, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্টেম-সেল বৈশিষ্ট্য রক্ষার সঙ্গে যুক্ত। aPC-তে চিকিৎসা পাওয়া কোষ কম বিভাজিত হয়েছে এবং সময়ের আগেই বিশেষায়িত রক্তকোষে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও কম ছিল।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ স্টেম কোষকে নিজেদের পুনর্নবীকরণ এবং রক্তব্যবস্থাকে পুনরায় পূরণ করার ক্ষমতা ধরে রাখতে হয়। সময়ের আগে বিভেদ ঘটলে সেই সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। aPC-এর বিপরীতে, থ্রম্বিন কোষগুলোর বেশি বিভেদন ঘটিয়েছে—যা স্টেম-সেল সম্ভাবনা কমাতে পারে।
এই ফলাফল কোষীয় সিগন্যালিং সম্পর্কে একটি বৃহত্তর বিষয় তুলে ধরে: শুধু রিসেপ্টরের পরিচয় ফল নির্ধারণ করে না। একই রিসেপ্টরের মাধ্যমে কাজ করা ভিন্ন অণু কোষকে যথেষ্ট ভিন্ন অবস্থার দিকে পরিচালিত করতে পারে। এখানে aPC-PAR1 আন্তঃক্রিয়া বিভেদনের পথে না নিয়ে একটি সুরক্ষিত অবস্থাকে সমর্থন করেছে বলে মনে হয়েছে।
এক ঘণ্টার চিকিৎসায় প্রভাব দেখা গেছে
প্রতিবেদিত হস্তক্ষেপটি ছিল স্বল্পমেয়াদি। গবেষকেরা দেখেছেন, মানব রক্তের স্টেম কোষকে এক ঘণ্টা aPC দিয়ে চিকিৎসা করলে ইঁদুরে তাদের প্রতিস্থাপন-ক্ষমতা বেড়েছে। ওই প্রাণী প্রতিস্থাপন মডেলে চিকিৎসা না পাওয়া কোষের তুলনায় চিকিৎসাপ্রাপ্ত কোষ বেশি মানব রক্তকোষ তৈরি করেছে বলে উৎস উপাদানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ফল আশাব্যঞ্জক, কারণ পরীক্ষাগারে প্রক্রিয়াজাতকরণ অনেক উন্নত কোষ-থেরাপি কর্মপ্রবাহের অপরিহার্য অংশ। প্রতিস্থাপনের জন্য নির্ধারিত কোষের কার্যকরী বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে অল্প সময়ে প্রয়োগ করা যায়—এমন চিকিৎসা, যদি পরবর্তী গবেষণাতেও এর প্রভাব বজায় থাকে, মূল্যবান হতে পারে।
গবেষণাটি University of Zurich এবং University of California, Santa Cruz-এর সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছে। এটি মানব রক্তের স্টেম কোষকে কেন্দ্র করে হলেও গবেষণায় বর্ণিত প্রতিস্থাপন-ফল একটি প্রাণী মডেল থেকে এসেছে। কী বলা যায়, তার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা: কাজটি একটি সম্ভাবনাময় প্রক্রিয়া ও প্রাক-ক্লিনিক্যাল ফলকে সমর্থন করে, রোগীদের জন্য প্রমাণিত ক্লিনিক্যাল চিকিৎসাকে নয়।
জিন থেরাপির সম্ভাব্য প্রাসঙ্গিকতা
রক্তের রোগের জিন থেরাপি সাধারণত রোগীর রক্তের স্টেম কোষ সংগ্রহ, শরীরের বাইরে সেগুলো পরিবর্তন এবং পরে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেওয়ার ওপর নির্ভর করে। এই ধারাবাহিকতার পর রক্ত তৈরি পুনরুদ্ধার করার কোষগুলোর ক্ষমতা সাফল্যের জন্য মৌলিক।
তাই গবেষকেরা পরীক্ষাগারে কোষ পরিচালনার সময় যে পুনরুৎপাদন ক্ষমতা কমে যেতে পারে, তা হ্রাস করার উপায় খুঁজছেন। জুরিখ দলের ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, বিকল্প কোনো সিগন্যালিং পথ নিয়ন্ত্রণ করা তেমনই একটি উপায় হতে পারে। ঘন ঘন বিভাজন বা প্রাথমিক বিভেদনের বদলে কুইসেন্সকে উৎসাহিত করে aPC চিকিৎসা কোষকে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার সঙ্গে যুক্ত বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
aPC-কে ক্লিনিক্যাল উৎপাদনে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, কোন রোগী বা রোগ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে, কিংবা বিভিন্ন চিকিৎসা প্রোটোকলে দেখা সুবিধা বজায় থাকবে কি না—এই গবেষণা তা প্রতিষ্ঠা করেনি। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও গবেষণা দরকার। ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা, মাত্রা, সময়, পুনরুৎপাদনযোগ্যতা এবং মানব গবেষণায় কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে।
ফলটি কেন উল্লেখযোগ্য
রক্তের স্টেম-সেল চিকিৎসা একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। কোষ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করতে হয়, আবার দীর্ঘমেয়াদে রক্ত ও রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা পুনর্গঠনের ক্ষমতাও তাদের ধরে রাখতে হয়। নতুন গবেষণাটি PAR1 সিগন্যালিংয়ের মাধ্যমে সেই ভারসাম্যকে প্রভাবিত করার একটি উপায় দেখায়।
এর মূল অন্তর্দৃষ্টি শুধু এই নয় যে aPC রক্তের স্টেম কোষকে প্রভাবিত করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই রিসেপ্টর ব্যবহার করা দুটি অণু বিপরীত কার্যকরী ফল দিতে পারে: aPC একটি বিশ্রামরত, সুরক্ষিত অবস্থাকে সমর্থন করে, আর থ্রম্বিন বেশি বিভেদনকে উৎসাহিত করে। এই পার্থক্য পরীক্ষাগারে প্রস্তুতির সময় স্টেম-সেল সক্ষমতা রক্ষার উপায় নিয়ে ভাবার জন্য গবেষকদের আরও নির্দিষ্ট লক্ষ্য দেয়।
এখনও এই ফল রোগীর চিকিৎসায় পরিবর্তন নয়, বরং একটি প্রাক-ক্লিনিক্যাল অগ্রগতি। তবু ইঁদুরের মডেলে প্রতিস্থাপন-ক্ষমতা বাড়ানো এক ঘণ্টার চিকিৎসা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ও জিন থেরাপির কর্মপ্রবাহকে আরও নির্ভরযোগ্য করার প্রচেষ্টায় একটি বাস্তব দিকনির্দেশ দেয়।
এই নিবন্ধটি Medical Xpress-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে তৈরি। মূল নিবন্ধ পড়ুন।
Originally published on medicalxpress.com



