প্রজনন কেন এখন মহাকাশযাত্রার প্রশ্ন হয়ে উঠছে

মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে জীবন মানবদেহকে কীভাবে বদলে দেয়, তা মহাকাশ সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে নথিভুক্ত করে আসছে। পেশি ও হাড়ের ক্ষয়, দেহতরলের স্থানান্তর, হৃদ্‌যন্ত্র-রক্তনালির পরিবর্তন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, এবং বিকিরণজনিত ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদি মিশনে থাকা মহাকাশচারীদের জন্য ইতিমধ্যেই সুপরিচিত উদ্বেগ। চাঁদে, এবং পরে মঙ্গলে আরও স্থায়ী মানব উপস্থিতির পরিকল্পনা যখন ধারণা থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে, গবেষকেরা এখন আরও কঠিন ও আরও ব্যক্তিগত এক প্রশ্নের মুখোমুখি: পৃথিবীর বাইরে গিয়ে প্রজনন কি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে?

এই সপ্তাহে আলোচনায় আসা একটি নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, শুধু শুক্রাণু ও ডিম্বাণুকে একই পরিবেশে রাখলেই বিষয়টি সহজ হয়ে যায় না। অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা মাইক্রোগ্র্যাভিটি অনুকরণ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা চালান, যেখানে মানুষের, শূকরের, এবং ইঁদুরের শুক্রাণু নিষেক-সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় কীভাবে আচরণ করে তা দেখা হয়। Communications Biology-এ প্রকাশিত তাদের ফলাফল একটি নির্দিষ্ট দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে: শুক্রাণু নড়াচড়া করতে পারে কি না, সেটা নয়; বরং ডিম্বাণু পর্যন্ত পৌঁছে সেটিকে নিষিক্ত করার জন্য যথেষ্ট কার্যকরভাবে দিকনির্দেশনা নিতে পারে কি না।

গবেষকেরা কী পরীক্ষা করেছেন

পরীক্ষাগুলো নিষেকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপে কেন্দ্রীভূত ছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় শুক্রাণু শুধু সামনে সাঁতরে যায় না। তাদের তরলপ্রবাহে সাড়া দিতে হয়, সরু পথের ভেতরে নিজেকে সঠিকভাবে স্থাপন করতে হয়, এবং এমন রাসায়নিক সংকেত অনুসরণ করতে হয় যা ডিম্বাণুর দিকে গাইড করে। এই গবেষণায় দেখা হয়েছে, মানুষের, শূকরের, এবং ইঁদুরের শুক্রাণুর নমুনা ব্যবহার করে চার ঘণ্টার সময়কালে সিমুলেটেড মাইক্রোগ্র্যাভিটি এই আচরণগুলোকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে।

এই নকশা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সফল নিষেক কোনো একক চলনপরীক্ষার ফল নয়; এটি একাধিক সমন্বিত প্রক্রিয়ার ফল। একটি শুক্রাণু কোষ সামগ্রিক অর্থে এখনও সচল থাকতে পারে, কিন্তু যাত্রা সম্পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশক সংকেত হারাতে পারে। সরবরাহ করা প্রতিবেদনের মতে, নতুন কাজের অবদান ঠিক সেখানেই। গবেষকেরা বিশেষভাবে জানতে চেয়েছিলেন, শুক্রাণু একটি চ্যানেলের ভেতর কীভাবে চলে এবং যে নির্দেশনা-ব্যবস্থা সাধারণত ডিম্বাণুতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়ায়, সেগুলোর প্রতি তারা কীভাবে সাড়া দেয়।

মানব শুক্রাণু সাঁতরেছে, কিন্তু দিক হারিয়েছে

মানব নমুনা থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল ছিল, সিমুলেটেড মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে শুক্রাণুর সাঁতারের ক্ষমতা সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কিন্তু নেভিগেশন বদলে গেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে মাইক্রোগ্র্যাভিটি যে ঝুঁকি তৈরি করে, তা প্রজনন কার্যক্রমকে সরাসরি বন্ধ করে দেওয়ার চেয়ে অনেক সূক্ষ্ম। বরং এই পরিবেশ শুক্রাণুর সেই ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে, যার মাধ্যমে সে নিষেকের সময় ব্যবহার করা দিকনির্দেশক তথ্য বুঝতে বা তার ওপর কাজ করতে পারে।

গবেষণায় প্রোজেস্টেরনকে একটি সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক উপায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা শুক্রাণুর জন্য রাসায়নিক সংকেত হিসেবে কাজ করে। প্রতিবেদিত পরীক্ষায়, এই সংকেত নেভিগেশন-সংক্রান্ত সমস্যাটি মোকাবিলায় সাহায্য করেছে। এর মানে এই নয় যে দীর্ঘমেয়াদি মিশনের জন্য প্রজনন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ সমাধান হয়ে গেছে। তবে এর মানে হলো, প্রক্রিয়াটি শনাক্ত করা সম্ভব, এবং অন্তত তাত্ত্বিকভাবে কিছুটা সংশোধনও করা যেতে পারে। মহাকাশ চিকিৎসার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। যদি কোনো জৈবিক সমস্যা ব্যাহত সিগন্যালিং প্রক্রিয়ায় নামিয়ে আনা যায়, তাহলে তার জন্য হস্তক্ষেপও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

প্রাণী পরীক্ষায় নিষেকের সাফল্য কমেছে

প্রাণী মডেলে ফলাফল আরও সরাসরি ছিল। গবেষকেরা দেখেছেন, পরীক্ষার শর্তে ইঁদুরের ক্ষেত্রে সফলভাবে নিষিক্ত ডিম্বাণুর সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমে গেছে। শূকরের শুক্রাণুতেও সফল নিষেক কমেছে বলে তারা জানিয়েছেন। এই ফলাফলগুলো শক্তভাবে দেখায়, পরিবর্তিত নেভিগেশন শুধু ল্যাবরেটরির কৌতূহল নয়, বরং এমন কিছু যা নিষেকের ফলাফল কমিয়ে দিতে পারে।

প্রাণী গবেষণা মানব প্রজননের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, এবং সরবরাহ করা সূত্রও তা দাবি করে না। কিন্তু সেগুলো প্রাসঙ্গিক, কারণ তারা দেখায় যে মাইক্রোগ্র্যাভিটি-সম্পর্কিত পরিস্থিতির পরিবর্তনে পরিমাপযোগ্য পরবর্তী প্রভাব থাকতে পারে। শুক্রাণু চলতে পারলেও যদি নিষেকের হার কমে যায়, তাহলে ভবিষ্যতের মহাকাশ প্রজনন পরিকল্পনায় পরিবেশগত সহায়তা ব্যবস্থা, চিকিৎসা প্রোটোকল, এবং সম্ভবত পৃথিবীর বাইরের পরিবেশের জন্য উপযোগী সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি বিবেচনায় নিতে হবে।

মানব বসতির বাইরেও কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

এই গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা কক্ষপথে বা অন্য কোনো জগতে মানুষের সন্তান ধারণের সম্ভাবনার বাইরেও বিস্তৃত। গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে প্রাথমিক নিষেক কীভাবে কাজ করে তা বোঝা বহির্জাগতিক বসতিতে খাদ্যব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি বসতি শুধু মানবজীববিদ্যার ওপর নির্ভর করবে না, বরং পৃথিবী থেকে নিয়মিত পুনরায় সরবরাহ ছাড়াই টেকসই প্রাণী জনসংখ্যা এবং বৃহত্তর জীবন-সমর্থন ব্যবস্থা বজায় রাখার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে।

এ কারণে প্রজনন একটি কৌশলগত সিস্টেম-সংক্রান্ত বিষয় হয়ে ওঠে, কোনো সীমিত বায়োমেডিকেল কৌতূহল নয়। বছরের পর বছর বা দশকের পর দশক ব্যবহারের জন্য পরিকল্পিত চাঁদের ঘাঁটি বা মঙ্গল বসতিতে শুধু জীবন-সমর্থন ও বিকিরণ প্রতিরোধই যথেষ্ট নয়। সেখানে এমন আস্থা দরকার হবে যে মৌলিক জৈবিক প্রক্রিয়া বদলানো মহাকর্ষীয় পরিস্থিতিতেও চলতে পারে, অথবা যেখানে প্রাকৃতিক কাজ ব্যর্থ হয় সেখানে প্রকৌশল ও চিকিৎসাগত বিকল্প আছে।

দীর্ঘ ইতিহাস ও বড় জ্ঞানের ফাঁক

মহাকাশে প্রজনন নিয়ে গবেষণা নতুন নয়। সূত্রটি জানায়, ১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত মিশনে মহাকাশে প্রাণীর মিলন ও গর্ভধারণ অনুসন্ধান করা হয়েছিল, আর পরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে করা কাজ মানব শুক্রাণুর কার্যকারিতার কিছু দিক পরীক্ষা করে। কিন্তু এত দীর্ঘ ধারাবাহিকতা সত্ত্বেও জ্ঞানের ভিত্তি এখনো অসম্পূর্ণ। আগের অনেক কাজ দেখিয়েছে যে মাইক্রোগ্র্যাভিটি প্রজননতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু সেই প্রভাব ঠিক কোন পথ ধরে তৈরি হয় তা স্পষ্ট করেনি।

এই নতুন গবেষণা সিমুলেটেড মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে প্রভাবিত হওয়া প্রক্রিয়াগুলোর একটি হিসেবে নেভিগেশন আচরণ চিহ্নিত করে ক্ষেত্রটিকে এগিয়ে নিচ্ছে বলে মনে হয়। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রোজেস্টেরনের মতো রাসায়নিক সংকেত হারানো কাজের কিছু অংশ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে বলেও এটি ইঙ্গিত দেয়। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এবং একটি সম্ভাব্য প্রশমন পথের এই সমন্বয়ই একটি অনুমানভিত্তিক উদ্বেগকে কার্যকর গবেষণা এজেন্ডায় রূপ দেয়।

মহাকাশ জীববিজ্ঞানের পরবর্তী ধাপ

এই ফলাফলকে মহাকাশে মানব প্রজনন অসম্ভব তার প্রমাণ হিসেবে পড়া উচিত নয়। বরং এটিকে এমন প্রমাণ হিসেবে বোঝা ভালো যে এই প্রক্রিয়ার জন্য এমন পরিবেশগত, চিকিৎসাগত, বা প্রযুক্তিগত সহায়তা লাগতে পারে, যা পৃথিবীতে দরকার হয় না। মহাকাশ সংস্থা ও বাণিজ্যিক কর্মসূচি দীর্ঘ মিশন এবং স্থায়ী অবকাঠামোর দিকে এগোতে থাকায়, প্রজননকে মহাকাশ জীববিজ্ঞানের প্রান্ত থেকে মিশন পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে।

এখনের জন্য, এই গবেষণা একটি সহজ কিন্তু বড় অর্থবহ পয়েন্ট তুলে ধরছে: মহাকাশে বেঁচে থাকা আর সেখানে প্রজনন করা এক নয়। যে ব্যবস্থা মহাকাশচারীদের কাজ করার মতো সুস্থ রাখে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন জীবন শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বজায় রাখতে পারে না। মানবজাতি যদি কেবল অস্থায়ী অর্থে নয়, সত্যিই একটি মহাকাশযাত্রী প্রজাতি হতে চায়, তাহলে সেই প্রশ্নের উত্তর এড়ানো যাবে না।

এই নিবন্ধটি Universe Today-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লেখা। মূল নিবন্ধটি পড়ুন.

Originally published on universetoday.com