বিশ্বের গঠনপর্বের একটি গ্যালাক্সির বিরল দৃষ্টিপাত

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহারকারী জ্যোতির্বিদেরা এমন একটি বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন, যাকে তারা প্রারম্ভিক মহাবিশ্বে এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে রাসায়নিকভাবে আদিম গ্যালাক্সি বলে বর্ণনা করছেন। LAP1-B নামে পরিচিত এই বস্তুটি বিগ ব্যাং-এর প্রায় ৮০০ মিলিয়ন বছর পরে অস্তিত্বে ছিল, সেই যুগে যাকে জ্যোতির্বিদেরা Epoch of Reionization বলেন। এই সময়কালটি মহাবিশ্বের দীর্ঘ “অন্ধকার যুগ” থেকে প্রথম প্রজন্মের তারকা ও গ্যালাক্সির আলোয় ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা এক মহাবিশ্বে রূপান্তরকে চিহ্নিত করে।

এই আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রসায়ন মহাজাগতিক ইতিহাসের একটি নথি। বিগ ব্যাং-এর পরপরই মহাবিশ্বে প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছিল। কার্বন ও অক্সিজেনের মতো ভারী মৌল পরে তারাদের ভেতরে তৈরি হতে হয়েছে এবং তারপর সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই অত্যন্ত কম ধাতবতাসম্পন্ন একটি গ্যালাক্সি গবেষকদের জন্য বিবর্তনের এমন একটি পর্যায়ের জানালা খুলে দেয়, যা শুরুর আরও কাছাকাছি, সেই সময়ের আগে যখন নক্ষত্র-প্রজন্মগুলো তাদের আশপাশকে সমৃদ্ধ করার জন্য বেশি সময় পেয়েছিল।

প্রদত্ত উৎস অনুযায়ী, কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর কিমিহিকো নাকাজিমার নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল LAP1-B-এর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে Webb-এর স্পেকট্রোমিটার এবং মহাকর্ষীয় লেন্সিংয়ের প্রাকৃতিক বর্ধন ব্যবহার করেছে। তাদের গবেষণা ১৩ মে Nature-এ প্রকাশিত হয়। দলটি উপসংহারে পৌঁছায় যে LAP1-B এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষিত প্রারম্ভিক মহাবিশ্বের সবচেয়ে ধাতব-দরিদ্র গ্যালাক্সি।

“ধাতব-দরিদ্র” কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র

জ্যোতির্বিজ্ঞানে, “ধাতু” বলতে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের চেয়ে ভারী প্রায় সব মৌলকে বোঝায়। পরবর্তী মহাজাগতিক জটিলতার জন্য, এমনকি গ্রহ ও জীবনের সঙ্গে যুক্ত রসায়নের ক্ষেত্রেও, এই মৌলগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মহাবিশ্বের প্রারম্ভিক যুগগুলোতে এগুলো খুবই অল্প ছিল বা ছিলই না। তাই ধাতব-দরিদ্র গ্যালাক্সি বিশেষভাবে মূল্যবান: এগুলো সেই পরিবেশের অবস্থা ধরে রাখতে পারে, যেখানে প্রথম তারাগুলি, যাদের প্রায়ই Population III তারা বলা হয়, গঠিত হয়েছিল।

গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে একটি আদিম মহাবিশ্ব থেকে নক্ষত্রীয় নিউক্লিওসিন্থেসিস-এ গঠিত মহাবিশ্বে রূপান্তর সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছেন। LAP1-B নিজে থেকে Population III তারার সনাক্তকরণ নিশ্চিত করে না। তবে এটি সেই সীমানার কাছাকাছি একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণগত ভিত্তি দেয়। কোনো গ্যালাক্সিতে রাসায়নিক সমৃদ্ধি যত কম, জ্যোতির্বিদেরা ততই কাছাকাছি থাকতে পারেন এমন সিস্টেম ধরার, যেগুলোতে প্রথম তারাদের উত্তরসূরি রয়েছে বা যেগুলো এখনও তাদের চিহ্ন সামান্যভাবে বহন করে।

উৎসপাঠে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে Webb-এর ইনফ্রারেড যন্ত্রই এই কাজকে সম্ভব করে। অত্যন্ত দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো, মহাবিশ্বের প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে টেনে লম্বা হয়, অর্থাৎ রেডশিফটেড হয়। সেই আলো যখন পৃথিবীতে পৌঁছায়, তখন একসময় দৃশ্যমান থাকা তরঙ্গদৈর্ঘ্য পুরোনো পর্যবেক্ষণাগারের ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। Webb ঠিক এই সমস্যার জন্যই তৈরি, এবং এর স্পেকট্রোস্কোপিক সক্ষমতা গবেষকদের কেবল শনাক্তকরণ থেকে পদার্থগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে নিয়ে যায়।

Webb এবং মহাকর্ষীয় লেন্সিং কীভাবে একসঙ্গে কাজ করেছে

LAP1-B-কে একটি অতিমাত্রায় ক্ষীণ গ্যালাক্সি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার অর্থ Webb-এর মতো সক্ষম টেলিস্কোপ দিয়েও এটি অধ্যয়ন করা কঠিন হতো। তাই গবেষক দলটি মহাকর্ষীয় লেন্সিংয়ের ওপর নির্ভর করে, যেখানে একটি অগ্রভাগের গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের ভর ব্যবহার করে আরও দূরের লক্ষ্যবস্তুর আলোকে বর্ধিত করা হয়। এই কৌশলটি মহাজাগতিক সময়ে আরও গভীরে পর্যবেক্ষণ ঠেলে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

লেন্সিং এবং ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপির এই সংমিশ্রণ Webb-কে কেবল একটি ধারালো ক্যামেরার চেয়ে অনেক বেশি কিছুতে পরিণত করছে। এটি প্রারম্ভিক গ্যালাক্সিগুলোর রাসায়নিক ও কাঠামোগত বিবর্তন পুনর্গঠনের একটি সরঞ্জাম হয়ে উঠছে। LAP1-B-এর ক্ষেত্রে, এর অর্থ ছিল “আকর্ষণীয় ক্ষীণ উৎস” থেকে গঠন ও বিবর্তনগত অবস্থা সম্পর্কে আরও নির্ভুল বক্তব্য দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করা।

বৃহত্তর তাৎপর্য হল, এখন জ্যোতির্বিদেরা প্রারম্ভিক মহাবিশ্ব-গবেষণাকে শুধু বয়স বা উজ্জ্বলতার ভিত্তিতে নয়, রসায়নের ভিত্তিতেও শ্রেণিবদ্ধ করার এক পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারেন। এটি একটি বড় পরিবর্তন। এটি প্রাথমিক গ্যালাক্সিগুলিকে অপেক্ষাকৃত বেশি বিকশিত প্রতিবেশীদের সঙ্গে তুলনা করার এবং সময়ের সঙ্গে প্রথম গ্যালাকটিক পরিবেশগুলো কীভাবে বদলেছে তার আরও বিস্তারিত অনুক্রম তৈরি করার সম্ভাবনা খুলে দেয়।

প্রারম্ভিক মহাবিশ্ব গবেষণার জন্য এর মানে কী

LAP1-B-এর গুরুত্ব শুধু এই নয় যে এটি পুরোনো। Webb ইতিমধ্যে মহাজাগতিক ইতিহাসের প্রথম এক বিলিয়ন বছরের মধ্যে থাকা বহু গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছে। এখানে আরও বিশেষ ফল হলো, এই গ্যালাক্সিটি সেই যুগের জন্যও অস্বাভাবিকভাবে ভারী মৌল-দরিদ্র বলে মনে হচ্ছে। ফলে এটি সেই তত্ত্বগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে, যেগুলো ব্যাখ্যা করে প্রথম তারাগুলো কীভাবে পরে আসা তারকা, গ্রহ এবং শেষ পর্যন্ত জীববিজ্ঞানের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান দিয়ে মহাবিশ্বকে বীজ বপন করেছিল।

উৎসপাঠে বলা হয়েছে, জ্যোতির্বিদেরা কয়েক দশক ধরে প্রথম তারাগুলো খুঁজে বের করার, অথবা অন্তত সেই মুহূর্তটি দেখার আশা করে আসছেন যখন তারা মহাবিশ্বকে সমৃদ্ধ করতে শুরু করেছিল। LAP1-B-এর মতো আবিষ্কার সেই অনুসন্ধান সম্পূর্ণ করে না, তবে ব্যবধান কমায়। প্রতিটি রাসায়নিকভাবে আদিম সিস্টেম তারাগঠন, ফিডব্যাক এবং প্রায় আদি পরিস্থিতিতে গ্যালাক্সি গঠনের মডেলের জন্য আরেকটি পরীক্ষার ক্ষেত্র দেয়।

এটি আরও দেখায় যে Webb কত দ্রুত পর্যবেক্ষণযোগ্য জ্যোতির্বিদ্যার সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। এর উৎক্ষেপণের আগে Epoch of Reionization-কে প্রায়ই হতাশাজনক দূরত্বে অবস্থানকারী, মডেল ও আংশিক পর্যবেক্ষণ থেকে অনুমিত একটি যুগ হিসেবে আলোচনা করা হতো। Webb সেই সময়কে আরও অভিজ্ঞতামূলক একটি ক্ষেত্রে পরিণত করছে, যেখানে গ্যালাক্সির রসায়ন, গঠন এবং পরিবেশ ক্রমবর্ধমান নির্ভুলতায় মাপা যায়।

ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণে যদি LAP1-B-এর মতো আরও সিস্টেম পাওয়া যায়, তবে জ্যোতির্বিদেরা কেবল প্রারম্ভিক গ্যালাক্সিগুলো কোথায় ছিল তা নয়, তাদের বিবর্তনপথ কতটা আলাদা হতে পারত তাও মানচিত্রে দেখাতে পারবেন। আপাতত, LAP1-B এক অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট নির্দেশচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, এমন এক তরুণ মহাবিশ্ব থেকে যে তখনই পরবর্তী সব কিছুর কাঁচামাল তৈরি করতে শুরু করেছিল।

আবিষ্কারটি কেন আলাদা

  • LAP1-B-এর অস্তিত্ব বিগ ব্যাং-এর প্রায় ৮০০ মিলিয়ন বছর পরে ছিল।
  • গ্যালাক্সিটিকে এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষিত সবচেয়ে ধাতব-দরিদ্র প্রারম্ভিক-মহাবিশ্ব গ্যালাক্সি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
  • ফলাফলটি James Webb স্পেকট্রোস্কোপি এবং মহাকর্ষীয় লেন্সিং উভয়ের ওপর নির্ভর করেছিল।
  • এই আবিষ্কার নক্ষত্রীয় রাসায়নিক সমৃদ্ধির ভোরের কাছাকাছি অবস্থার আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়।

এই নিবন্ধটি Live Science-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লেখা। মূল নিবন্ধ পড়ুন.

Originally published on livescience.com