হিমালয়ে ভবন বাড়ায় সম্ভাব্য বন্যা-ঝুঁকিও বাড়ছে
Scientific Reports-এ প্রকাশিত নতুন এক গবেষণা অনুযায়ী, হিমালয়ের কিছু অংশে প্রায় ৩,০০,০০০ মানুষ এখন এমন ভবনে বসবাস করতে পারেন, যেগুলো বন্যার সম্ভাব্য ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সম্ভাব্য বন্যাপ্রবণ এলাকায় ভবনের আয়তন দ্রুত বেড়েছে। বর্ষা, খাড়া উপত্যকা এবং হিমবাহ-হ্রদে গঠিত এই অঞ্চলে জনবসতি কোথায় এবং কীভাবে বাড়ছে, সেই প্রশ্নকে এটি আরও জরুরি করে তুলেছে।
গবেষণাটি নেপাল এবং ভারত ও চীনের সংলগ্ন অংশের এমন এলাকাগুলো পরীক্ষা করেছে, যেগুলো ১,৩৬১টি হিমালয়ী হ্রদের ভাটির দিকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মূল অনুসন্ধান এই পূর্বাভাস নয় যে প্রতিটি ভবনই বন্যায় প্লাবিত হবে। বরং এটি সম্ভাব্য ঝুঁকিতে পড়ার একটি হিসাব: তীব্র বন্যার সময় যেসব স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তার একটি সূচক হিসেবে গবেষকেরা নদীর প্রবাহপথের কাছের ভবনের পদচিহ্নের মানচিত্র তৈরি করেছেন।
যে অঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি নানা রূপ নিতে পারে, সেখানে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। মৌসুমি বর্ষা ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিকর বন্যা হতে পারে, আবার ধসজাতীয় ধ্বংসাবশেষের স্রোত এবং হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা তুলনামূলক বিরল হলেও সম্ভাব্যভাবে বিপর্যয়কর ঢল তৈরি করতে পারে। লেখকেরা উল্লেখ করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমন ঘটনার তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ি উপত্যকার খাড়া, সংকীর্ণ ভূপ্রকৃতি বন্যার উচ্চতা ও তার পরিণতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রবাহপথের কাছে ভবনের পদচিহ্নে ৪৫% বৃদ্ধি
উন্নয়ন পর্যবেক্ষণের জন্য C. Scott Watson এবং তাঁর সহকর্মীরা হাতে নথিভুক্ত তথ্যের সঙ্গে যাচাই করা পাঁচটি ডেটাসেট ব্যবহার করেছেন। তাঁরা গবেষণা এলাকায় ভবনের পদচিহ্নের হিসাব করেছেন এবং নদীর প্রবাহপথের উল্লম্বভাবে ৫০ মিটারের মধ্যে নির্মাণের পরিমাণ মেপেছেন। সম্ভাব্য বন্যা-ঝুঁকির একটি সূচক হিসেবে গবেষণায় এই সীমা ব্যবহার করা হয়েছে।
এই পরিমাপ অনুযায়ী, সম্ভাব্যভাবে ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় ভবনের পদচিহ্ন সাত বছরে ৪৫.৭৫% বেড়েছে—২০১৬ সালে ১২.৩৮ বর্গকিলোমিটার থেকে ২০২৩ সালে ১৮.০৪ বর্গকিলোমিটারে। হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার উচ্চ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত এলাকায় বৃদ্ধি আরও বেশি: ৭৭.৭৮%, অর্থাৎ ০.৭২ থেকে ১.২৮ বর্গকিলোমিটার।
এই সংখ্যা হিমালয়ী উন্নয়নের একটি বাস্তব দ্বন্দ্বের দিকে ইঙ্গিত করে। মানুষের বাড়ি, পরিষেবা, রাস্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দরকার—আর এগুলো প্রায়ই এমন উপত্যকায় কেন্দ্রীভূত হয়, যেখানে বসতি ও পরিবহনপথ উভয়ই ঘন। কিন্তু একই করিডরগুলো নদী অনুসরণ করে এবং এমন হ্রদের নিচে অবস্থিত, যেগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সেখানে নির্মাণ বাড়লে, মূল ঝুঁকি অপরিবর্তিত থাকলেও সম্ভাব্যভাবে বিপদের মুখে থাকা মানুষ ও সম্পদের সংখ্যা বাড়তে পারে।
বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে, ২০২৬ সালে গবেষণা এলাকার প্রায় ২,৯৩,৮০০ মানুষ সম্ভাব্য বন্যাপ্রবণ ভবনে বসবাস করতে পারেন। এটি গবেষণার আওতাভুক্ত জনসংখ্যার প্রায় ১৮%। এর মধ্যে নেপালে আনুমানিক ১,০৮,৫০০ জন রয়েছেন; তাঁদের মধ্যে প্রায় ২২,৮০০ জন নদীর প্রবাহপথের উল্লম্বভাবে ১০ মিটারের মধ্যে বসবাস করেন।
ঝুঁকিতে থাকা মানেই বন্যার পূর্বাভাস নয়
গবেষকেরা তাঁদের হিসাবের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সতর্ক। কোনো ভবন প্রবাহপথের কাছে রয়েছে—এতে প্রমাণ হয় না যে কোনো নির্দিষ্ট বন্যায় সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই বিশ্লেষণ স্থানভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির মডেলও নয়। গবেষণাটি ভবনের পদচিহ্নের হিসাব ও জনসংখ্যার পূর্বাভাসের ওপর নির্ভরশীল, এবং লেখকেরা দুটিকেই অত্যন্ত অনিশ্চিত বলে বর্ণনা করেছেন।
হিমালয় ভৌগোলিকভাবে জটিল হওয়ায় এই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। উপত্যকার আকৃতি, নদীর আচরণ, হ্রদের আকার ও অবস্থা, বৃষ্টিপাত, ধ্বংসাবশেষ এবং স্থানীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বন্যার গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। বিস্তৃত আঞ্চলিক মূল্যায়ন স্থানীয় ঝুঁকি-মানচিত্র বা জরুরি পরিকল্পনার বিকল্প হতে পারে না। তবু এটি দেখাতে পারে কোথায় উন্নয়ন দ্রুততম গতিতে এগোচ্ছে এবং কোথায় আরও বিশদ ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, চিহ্নিত বন্যা-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ২০১৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ১৭,৯০০ জন, অর্থাৎ ৬%, বাড়তে পারে। এই পূর্বাভাস দেখায় যে চরম আবহাওয়া বা পরিবর্তনশীল হিমবাহের পাশাপাশি ভবন কোথায় নির্মাণ করা হবে—এমন সাধারণ সিদ্ধান্ত থেকেও ঝুঁকি তৈরি হয়।
কেন এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ
হিমালয়ের বন্যা-ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা প্রায়ই নাটকীয় ঘটনাকে ঘিরে হয়: বর্ষার দুর্যোগ, হ্রদের আকস্মিক বিস্ফোরণ বা নদীর পথ আটকে ও ঘুরিয়ে দেওয়া ভূমিধস। নতুন বিশ্লেষণ একটি ধীরে বাড়তে থাকা কারণকে সামনে এনেছে। উন্নয়নের ধরন এসব ঘটনার পরিণতি ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দিতে পারে।
পরিকল্পনাবিদ ও দুর্যোগ সংস্থাগুলোর জন্য গবেষণাটির মূল্য হলো আঞ্চলিক গতিপথ চিহ্নিত করা। সম্ভাব্য বন্যা-করিডরের ভেতরে বা কাছাকাছি নির্মাণ বাড়ছে, যার মধ্যে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার উচ্চ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত এলাকাও রয়েছে। এটি আরও সূক্ষ্ম মানচিত্র তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নতুন ভবনের স্থান নির্ধারণ মূল্যায়ন এবং বাড়তে থাকা ঝুঁকির মুখে থাকা সম্প্রদায়গুলোর প্রস্তুতি জোরদারের ভিত্তি দিতে পারে।
ফলাফলগুলো জলবায়ু-অভিযোজনের বৃহত্তর চ্যালেঞ্জও তুলে ধরে। পাহাড়ি অঞ্চলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শুধু বন্যার পরে সাড়া দেওয়ার বিষয় নয়। কোনো ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, ভূমি-ব্যবহার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং জনসংখ্যা পরিকল্পনাকে একত্র করা এর অংশ। গবেষণাটি কোনো একক নীতিগত প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করে না, তবে এর হিসাব বলছে উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করলে আরও বেশি মানুষ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
এরপর কী
লেখকদের অনিশ্চয়তার সতর্কতা উন্নত তথ্যের প্রয়োজনীয়তার কারণ, নিষ্ক্রিয়তার নয়। ভবন, বাসিন্দা, নদীর প্রবাহপথ এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য কারা কোথায় ঝুঁকিতে আছেন এবং কোথায় পদক্ষেপ নিলে সবচেয়ে বেশি ফল পাওয়া যাবে—তা নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে। এর মধ্যে প্রবাহপথের কাছে ভবনের পদচিহ্নে তীব্র বৃদ্ধি সরকার, গবেষক ও সম্প্রদায়গুলোর জন্য একটি পরিমাপযোগ্য সংকেত দিচ্ছে।
হিমালয় অঞ্চল মৌসুমি ও চরম জল-ঝুঁকির মুখোমুখি হতে থাকবে। ঝুঁকি মূল্যায়ন ও কমানোর চেয়ে বসতি বৃদ্ধি দ্রুততর গতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি বাড়িয়ে যাবে কি না—এই প্রশ্নই গবেষণাটি তুলেছে।
এই নিবন্ধটি Phys.org-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি। মূল নিবন্ধটি পড়ুন।
Originally published on phys.org






